
কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া::
কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলা জুড়ে অপহরণ পাচার আতংকে রয়েছে সাধারণ লোকজন। মালয়েশিয়া পাচারের ঘটনা আশংকা জনকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিভাবকরা আতংকে দিন কাটাচ্ছে। সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী দালাল চক্ররা আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমন কোন দিন নেই গ্রামগঞ্জের আনাছে কানাছে উৎপেতে অবস্থান নিয়ে যেকোন বয়সী লোকজনদের ভালো চাকরী ও মোটাংকের বেতনের রাতের আধারে দালালরা মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলে দিচ্ছে নিরহ লোকজনদেরকে। সম্প্রীতি এক মানসিক প্রতিবন্ধী ও ২ জন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার্থী ছাত্রকে অপহরণ করার ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলশ্র“তিতে চলমান সমাপনী পরীক্ষায় অধিকাংশ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি বলে সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ বলছে, মানবপাচারকারীদের আটক করার জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে।
জানা গেছে, উখিয়ার উপকূলীয় এলাকা জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী, ছেপটখালী, মাদারবনিয়া, চোয়াংখালী, ইনানী, সোনাইছড়ি, বাদামতলী ঘাট ও রেজুখালের মোহনা মানবপাচারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে জনশ্র“তি থাকলেও তা এখন গ্রামগঞ্জে বি¯তৃতি লাভ করেছে। সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টে উৎপেতে অবস্থান করে অবিনব কায়দায় লোকজনদের অপহরণ করে ৪/৫দিন আটকিয়ে রাখার পর সাগর পথে পাচার করে দিচ্ছে।
সম্প্রীতি অপহরণ পরে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া পাচারের নামে অহরহ শিশু কিশোর, ছাত্র, প্রতিবন্ধী মানবপাচারকারীদের হাতে অপহৃত হয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সর্বত্রে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবকদের মাঝে বিরাজ করছে অজানা আতংক। সোনারপাড়া গ্রামের হামিদ উলাহর ছেলে আব্দুল হামিদ জানান, তার ভাগিনা ইনানী গ্রামের হাকিম আলীর ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী রফিক উলাহ (১৮) গত ১৩ জুন পরিবারের অজান্তে বাড়ি থেকে রেব হয়ে উপকূলে গেলে মানবপাচারকারীরা তাকে অপহরণ করে পাচার করে দেয়। পরিবারের অভিযোগ এপর্যন্তও তার খোঁজ খবর মিলেনি। এব্যাপারে হাকিম আলী বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি অভিযোগ করলে গত রবিবার ডিবি পুলিশ কক্সবাজার আদালত পাড়া এলাকা থেকে মানবপাচারকারী সোনারপাড়া গ্রামের নুরুল কবিরের স্ত্রী রেজিয়া আকতার রেবি কে গ্রেপ্তার করে। ডিবির ওসি দেওয়ান আবুল হোছেন জানান, তার বিরুদ্ধে ২টি মামলা রুজু করা হয়েছে। ইতিপূর্বেও উখিয়া থানায় নুরুল কবির ও তার স্ত্রী রেজিয়া আকতার রেবির বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে ৭টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে রাজাপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রীতিকণা দাশ জানান, তার স্কুলের ২ জন সমাপনী পরীক্ষার্থী রাজাপালং খালকাঁচাপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম (১২) ও আব্দুর রহিম(১১)কে মানবপাচারকারীরা অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের পরিবার দালালদের মোটা অংকের টাকা মুক্তিপন দিয়ে ছেলে ২টিকে উদ্ধার করেছে। জালিয়াপালং ইউনিয়নের জুম্মাপাড়া গ্রামের স্বামী পরিত্যাক্ত বয়োবৃদ্ধ মহিলা ছখিনা খাতুন জানান, পাচারকারীরা তার একমাত্র ছেলে আব্দুলাহ আল মামুন(১৫) কে গত ১ মাস আগে অপহরণ করে পাচার করে দেয়। পথিমধ্যে মামুন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে গভীর সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। এভাবে অহরহ অপহরণ ও পাচারের ঘটনায় গ্রামগঞ্জের সাধারণ অভিভাবক মহল আতংকে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সমাপনী পরীক্ষায় অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উখিয়া প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এস এম কামাল উদ্দিন বলেন, মানবপাচারকারী কর্তৃক সমাপনী পরীক্ষার্থী অপহরণ পরে উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে অধিকাংশ অভিভাবক তাদের ছেলেদের পরীক্ষার হলে পাঠায়নি। যে কারণে গত ৩ দিনের পরীক্ষায় আড়াই শতাধিক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। স্থানীয় মানবপাচার প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক এম এ কাশেম জানান, তার অফিসে প্রতিনিয়ত নিখোঁজ মালয়েশিয়াগামী যাত্রীর পরিবার গুলো অভিযোগ নিয়ে আসছে। তিনি এব্যাপারে থানা পুলিশের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানবপাচার বন্ধ করার পদক্ষেপ নিলেও তা কোন কাজে আসছে না বলে মতামত ব্যক্ত করে জানান, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না হলে তা কোনদিন বন্ধ হবে না। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) হাবিবুর রহমান জানান, মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তার করার জন্য ও যাত্রীদের উদ্ধার করে তাদের বাসা বাড়িতে ফেরত পাঠানোর জন্য পুলিশ কাজ করছে।
পাঠকের মতামত